ঋন মুক্তি ও রিজিক বৃদ্ধির দু’আ ও আমল

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ঋন মুক্তি ও রিজিক বৃদ্ধির কিছু দু’আ ও আমল আলোচনা করা হলঃ

রিজিক বৃদ্ধির দু’আ

রিজিক বৃদ্ধিতে দু‘আর প্রয়োজনীয়তা

রিজিক অর্জনে এবং অভাব দূরীকরণে প্রয়োজন আল্লাহর কাছে দু‘আ করা। কারণ, তিনি প্রার্থনা কবুল করেন। আর আল্লাহ তা‘আলাই রিজিকদাতা এবং তিনি অসীম ক্ষমতাবান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

আর তোমাদের রব বলেছেন, ”তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব।”

সূরা আল-মু‘মিন, আয়াত : ৬০

এ আয়াতে আল্লাহ দু‘আ করার নির্দেশ দিয়েছেন আর তিনি তা কবুলের জিম্মাদারি নিয়েছেন। যাবৎ না তা কবুলে পথে কোনো অন্তরায় না হয়। যেমন ওয়াজিব তরক করা, হারাম কাজে জড়ানো, হারাম আহার গ্রহণ বা হারাপ পরিচ্ছদ পরা ইত্যাদি এবং কবুলকে খানিক বিলম্বিতকরণ। অভাবকালে মানুষের কাছে হাত না পেতে আল্লাহর শরণাপন্ন হলে এবং তাঁর কাছেই প্রাচুর্য চাইলে অবশ্যই তার অভাব মোচন হবে এবং রিজিক বাড়ানো হবে। আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

‘যে ব্যক্তি অভাবে পতিত হয়, অতপর তা সে মানুষের কাছে সোপর্দ করে (অভাব দূরিকরণে মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়), তার অভাব মোচন করা হয় না। পক্ষান্তরে যে অভাবে পতিত হয়ে এর প্রতিকারে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হয় তবে অনিতবিলম্বে আল্লাহ তাকে তরিৎ বা ধীর রিজিক দেবেন।

তিরমিযী : ২৮৯৬; মুসনাদ আহমদ : ৪২১৮

দু‘আ ১

আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, একবার এক চুক্তিভুক্ত ক্রীতদাস (অর্থের বিনিময়ে যে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ) তার নিকট এসে বললো, ‘আমি আমার দাসমুক্তির অর্থ পরিশোধে অক্ষম, দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন!’ তিনি উত্তর দিলেনঃ ‘আমি কি তোমাকে একটি দু’আ শিখিয়ে দেব যা আমাকে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) শিখিয়েছেন? এবং তোমার যদি পাহাড় পরিমান দেনাও থাকে, আল্লাহ তোমার পক্ষ থেকে তা শোধ করে দেবেন।’। অতঃপর তিনি এই দু’আটা শিক্ষা দিলেনঃ

اَللّٰهُمَّ اكْفِنِيْ بِحَلاَلِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِيْ بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ

অর্থঃ ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার হালাল দ্বারা পরিতুষ্ট করে আপনার হারাম থেকে ফিরিয়ে রাখুন এবং আপনার অনুগ্রহ দ্বারা আপনি ছাড়া অন্য সকলের থেকে আমাকে অমুখাপেক্ষী করে দিন।’

তিরমিযী ৫/৫৬০, নং ৩৫৬৩

দু‘আ ২

রাসূল (সাঃ) আবু বকর (রাঃ) কে একটি দু’আ শিক্ষা দিয়েছেন যা তিনি নিজেও পরতেন এবং এর উপর অতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন (মুস্তাদরাক হাকিম ১ম খন্ড)

اللَّهُمَّ فَارِجَ الْهَمِّ، كَاشِفَ الْغَمِّ، مُجِيبَ دَعْوَةِ الْمُضْطَرِّينَ، رَحْمَانَالدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَرِحِيمَهُمَا، أَنْتَ رَحْمَانِي فَارْحَمْنِي رَحْمَةً تُغْنِينِي بِهَا عَنْ رَحْمَةِ مَنْ سِوَاكَ

অনুবাদ: হে আল্লাহ, আপনি পেরেশানি দুর করার মালিক, যত চিন্তা আছে সব চিন্তা লাঘবকারী, যারা দুর্দশাগ্রস্ত হতে হতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে সে সকল নিরুপায় মানুষের দাওয়াত ও আহবানে সাড়া দানকারী, দুনিয়া এবং আখিরাতে আপনি রহমান, উভয় জগতে আপনি রাহিম, আপনি আমাকে দয়া করেন। সুতরাং আমাকে এমন অনুগ্রহ দ্বারা দয়া করুন যা আপনি ছাড়া অন্য সবার অনুগ্রহ থেকে আমাকে সম্পুর্ণ অমুখাপেক্ষী করে দিবে।

তাবরানী রচিত কিতাবুদ দুআ, হাদীস নং ১০৪১, মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস নং ১৮৯৮

দু‘আ ৩

রাসূল (সাঃ) উম্মতকে আরো একটি দু’আ শিক্ষা দিয়েছেন যা তিনি নিজেও বেশি পরতেন। এই দু’আ পড়লে যাবতীয় ঋন এর বোঝা এবং দুঃশ্চিন্তা থেকে আল্লাহ মুক্তি দিবেন।

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ

অনুবাদ: হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট দুঃখ ও দুশ্চিন্তা থেকে, অপারগতা-অলসতা থেকে, কৃপণতা এবং কাপুরুষতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। অধিক ঋণ থেকে ও খারাপ লোকের জবরদস্তি থেকেও আশ্রয় চাচ্ছি।

বুখারী ৭/১৫৮, হাদীস নং ২৮৯৩

দু‘আ ৪

আল্লাহর নবী মুসা (আঃ) আল্লাহর নিকট একটি দু’আর মাধ্যমে রিজিক প্রার্থনা করেন এবং আল্লাহ সুবহানুতা’আলা তার ডাকে সাড়া দিয়ে তাকে খাবার, আশ্রয় ও নিরাপত্তা, বিয়ের ব্যবস্থা সহ যাবতীয় রিযিকের ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই দু’আটি হলঃ

رَبِّ إِنِّى لِمَآ أَنزَلْتَ إِلَىَّ مِنْ خَيْرٍۢ فَقِيرٌۭ

অনুবাদ: হে আমার প্রভু! নিশ্চয়ই আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহই নাজিল করবেন; আমি তার মুখাপেক্ষী।

সুরা কাসাস : আয়াত ২৪

দু‘আ ৫

হজরত উম্মে সালামা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামাজের সালাম ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গেই নিয়মিত নিচের দোয়াটি পড়তেন (এর মাধ্যমে উত্তম রিযিক ও অন্যান্য জিনিস চাওয়া হয়েছে।)

اَللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا , وَ رِزْقًا طَيَّبًا , وَ عَمَلاً مُتَقَبَّلاً

অনুবাদ: ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে এমন ইলম চাই যা আমার জন্য উপকারী। এমন রিজিক চাই যা আমার জন্য পবিত্র ও হালাল। এবং এমন আমলের তাউফীক চাচ্ছি যা তোমার দরবারে কবূল হবে।’

ইবনে মাজাহ-৯২৫, নাসায়ি সুনানে কুবরা-৯৯৩০

উল্লেখ্য, এই দু’আটি সকাল-সন্ধ্যার যিকরের সুন্নাহ আমলের অন্তর্ভূক্ত।

দু‘আ ৬

আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মু’আয (রাঃ) কে বলেন, যদি তুমি এই (নিম্নোক্ত) দু’আটি বলে প্রার্থনা কর তাহলে তমার পাহাড় পরিমাণ ঋণ থাকলেও আল্লাহ তা তোমার পক্ষ থেকে তা আদায় করে দেবেন।

অনুবাদ: ‘ইয়া আল্লাহ! আপনিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারী। আপনি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান করেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নেন, যাকে ইচ্ছা সম্মান দান করেন আর যাকে ইচ্ছা অপমানে পতিত করেন। আপনারই হাতে রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। নিশ্চয়ই আপনি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল। পার্থিম জগত ও পারলৌকিক জগতের মহাকরুণাময় ও অপার দয়াশীল। আপনি যাকে ইচ্ছা করুণা প্রদান করেন আর যাকে ইচ্ছা বঞ্চিত করেন। আপনি আমাকে এমন রহমত প্রদান করুন যা আমাকে আপনি ছাড়া অন্য কারো করুণা থেকে অমুখাপেক্ষী বানিয়ে দেবে।’

সূরা আল ইমরান ২৬, তাবরানী, আল-মু’জামুস সাগীর ১/৩৩৬

দু‘আ ৭

আল-আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু), রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চাচা, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে আসলেন আর জিজ্ঞাসা করলেন — ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাকে একটা দু’আ শিখিয়ে দিন।’

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন —’হে আমার চাচাজান, বলুন:

আল্লাহুম্মা ইন্নি আস’আলুকা আল-‘আফ্যিয়া।’

অর্থঃ ‘হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে ‘আফ্যিয়া চাচ্ছি’

আফ্যিয়া কি? যখন আমরা মহান আল্লাহ্’র কাছে আফ্যিয়া চাই তখন তা বুঝায় —

🔸যেকোন দু:খ-দর্দশা থেকে মুক্তির জন্য দু’আ

🔸সুস্বাস্থ্য অর্জনের জন্য দু’আ

🔸বেচে থাকার তাগিদে আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য দু’আ

🔸সন্তানের সুরক্ষার

🔸শাস্তির পরিবর্তে ক্ষমা পাবার জন্য দু’আ

অর্থাত, এক কথায় আফ্যিয়া অর্থ ‘ইয়া আল্লাহ, আমাকে সকল দু:খ, গ্লানি ও ভোগান্তি থেকে রক্ষা কর’ দুনিয়া এবং আখিরাতে উভয় যায়গায়ই।

আল-আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) খানিক চিন্তা করলেন এবং দিন কয়েক পরে ফিরে আসলেন এবং বললেন — ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, এতো খুবই ছোট্ট দু’আ, আমাকে বড় কিছু শিক্ষা দিন’।

তখন রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন — ‘ও আমার প্রাণপ্রিয় চাচা, আল্লাহ্’র কাছে আফ্যিয়া কামনা করুন, আল্লাহ’র কসম এর চাইতে উত্তম কোন জিনিস আপনাকে দেওয়া সম্ভব না’।

এটা খুবই ছোট্ট দু’আ, যার মাধ্যমে আমরা বুঝাই —’ওহ! আল্লাহ, আমি পরিত্রাণ চাই মর্মপীড়া, বিষাদ, কষ্ট, ক্ষতি থেকে; আমাকে পরীক্ষা করো না’। রাব্বে ক্বারীমের কাছে এরকম সকল কিছুই আমরা চেয়ে থাকি এই বলে: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আস’আলুকা আল-আফ্যিয়া।’ [রিয়াদ্বুস স্বলেহীন, সুনান আত-তিরমিযী]

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَافِيَةَ

অর্থঃ ‘হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে ‘আফ্যিয়া চাচ্ছি’

রিয়াদ্বুস স্বলেহীন, সুনান আত-তিরমিযী

রিজিক বৃদ্ধির আমল ০১: ইস্তেগফার

রিজিক বৃদ্ধিতে ইস্তেগফার এর গুরুত্ব

একবার হাসান বসরী রাহ. এর কাছে এক ব্যক্তি জানালো “ আমার ফসলে খরা লেগেছে। আমাকে আমল দিন” হাসান বসরী তাকে বললেন এস্তেগফার করো। কিছুক্ষণ পর আরেক ব্যক্তি এসে অভিযোগ পেশ করল “আমি গরীব। আমাকে রিজক এর আমল দিন” হাসান রহ. তাকেও বলেলন এস্তেগফার করো। এমনিভাবে অপর এক ব্যক্তি এসে সন্তান হও্য়ার আমল চাইলে তিনি বললেন, এস্তেগফার করো।” উপস্থিত ছাত্ররা জিজ্ঞেস করল, “সবাইকে এক পরামর্শই দিলেন যে?” বিখ্যাত তাবেয়ী হাসান বসরী রহ. বললেন “আমি নিজের পক্ষ থেকে কিছুই বলি নি। এটা বরং আল্লাহ তায়ালা তার কুরআনে শিখিয়েছেন । তারপর তিনি সুরা নুহ এর নিম্নোক্ত আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন। (তাফসীরে কুরতুবী ১৮/৩০৩)

‘আর বলেছি, ‘তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল’। (তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলে) ‘তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, ‘আর তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দেবেন আর দেবেন নদী-নালা’।

সূরা নূহ, আয়াত : ১০-১২

অর্থাৎ অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার এবং বেশি বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও রিজিক বাড়ে (ও সন্তান-সন্ততি লাভ হয়)। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর অন্যতম নবী ও রাসূল নূহ আলাইহিস সালামের ঘটনা তুলে ধরে পবিত্র কুরআনে তাই ইরশাদ করেন। হাদীসে বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করে বলা হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের সংস্থান করে দেবেন।’

আবূ দাঊদ : ১৫২০; ইবন মাজা : ৩৮১৯; তাবরানী : ৬২৯১

অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

‘যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তেগফার করবে আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন।’

বাইহাকী : ৬৩৬; হাকেম, মুস্তাদরাক : ৭৬৭৭ সহীহ সূত্রে বর্ণিত।

সাইয়েদুল ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনার শ্রেষ্ঠ দো‘আ)

বুখারী শরিফে বর্ণিত হাদিসে রাসূল (সাঃ) বলেনঃ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থণার সর্বশ্রেষ্ঠ দু’আ হলঃ

اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي، لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَىَّ وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لاَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلاَّ أَنْت

অর্থঃ ‘হে আল্লাহ! তুমি আমার পালনকর্তা। তুমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তুমি আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি তোমার দাস। আমি আমার সাধ্যমত তোমার নিকটে দেওয়া অঙ্গীকারে ও প্রতিশ্রুতিতে দৃঢ় আছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট হ’তে তোমার নিকটে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি আমার উপরে তোমার দেওয়া অনুগ্রহকে স্বীকার করছি এবং আমি আমার গোনাহের স্বীকৃতি দিচ্ছি। অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা কর। কেননা তুমি ব্যতীত পাপসমূহ ক্ষমা করার কেউ নেই’।

হীহ বুখারীঃ ৬৩০৬

ক্ষমা চাওয়ার আরেকটি ইস্তেগফার

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, “যে ব্যক্তি নিচের দু’আটি বলবে, আল্লাহ তাকে মাফ করে দিবেন যদিও সে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়নকারীও হয়“ (যা একটি বড় গুনাহের কাজ)।

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الْعَظِيمَ الَّذِي لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَيُّ الْْقَيُّومُ وَ أَتُوبُ إِلَيْهِ

আমি মহামহিম আল্লাহ্‌র নিকট ক্ষমা চাই, যিনি ছাড়া আর কোনো হক্ব ইলাহ নেই, তিনি চিরস্থায়ী, সর্বসত্তার ধারক। আর আমি তাঁরই নিকট তওবা করছি।

আবূ দাউদ ২/৮৫ (নং ১৫১৭); তিরমিযী ৫/৫৬৯ (নং ৩৫৭৭)

রিজিক বৃদ্ধির আমল ০২: নবী (সাঃ) এর ওপর দরূদ পড়া

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠেও রিজিকে প্রশস্ততা আসে। যেমনটি অনুমিত হয় নিম্নোক্ত হাদীস থেকে। তোফায়েল ইবন উবাই ইবন কা‘ব রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন:

আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনার প্রতি অধিকহারে দরূদ পড়তে চাই, অতএব আমার দু‘আর মধ্যে আপনার দরূদের জন্য কতটুকু অংশ রাখব? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। কা‘ব বলেন, আমি বললাম, এক চতুর্থাংশ। তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। তবে যদি তুমি বেশি পড় তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, অর্ধেক? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। তবে তুমি যদি বেশি পড় তা তোমার জন্য উত্তম হবে। কা‘ব বলেন, আমি বললাম, তাহলে দুই তৃতীয়াংশ? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। তবে তুমি যদি বেশি পড় তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, আমার দু‘আর পুরোটা জুড়েই শুধু আপনার দরূদ রাখব। তিনি বললেন, তাহলে তা তোমার ঝামেলা ও প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে।

তিরমিযী : ২৬৪৫; হাকেম, মুস্তাদরাক : ৭৬৭৭

দরূদে ইব্রাহীম – পূর্ণাংগ ও উত্তম দরূদ

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ ❁ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيْمَ ❁ إنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ ❁ اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ ❁ كَمَا بَارَكْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيْمَ ❁ إنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ

অর্থঃ’ হে আল্লাহ, দয়া ও রহমত করুন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর প্রতি এবং তার বংশধরদের প্রতি, যেমন রহমত করেছেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তার বংশধরদের উপর। নিশ্চই আপনি উত্তম গুনের আধার এবং মহান। হে আল্লাহ, বরকত নাযিল করুন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর প্রতি এবং তার বংশধরদের প্রতি, যেমন করেছেন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ও তার বংশধরদের উপর।নিশ্চই আপনি প্রশংসার যোগ্য ও সম্মানের অধিকারী।’

ছোট একটি দরূদ যা আপনি খুব অল্প সময়েই পড়তে পারবেন

নাসাঈ (১২৯২) এ বর্ণিত আছে যে, মুসা ইবনে তালহা বলেনঃ “আমি যায়েদ বিন খারিজা কে জিজ্ঞাসে করলে তিনি বলেন: ‘আমি আল্লাহর রাসূল (ﷺ) কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম এবং তিনি বলেছিলেন: আমার উপর দরূদ পাঠাও আর দু’আ কর এবং বলঃ

اللَّهُمَّ صل عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ

অর্থঃ’ হে আল্লাহ, দয়া ও রহমত করুন হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) এর প্রতি এবং তার পরিবারের প্রতি।’

নাসাঈ (১২৯২)

রিজিক বৃদ্ধির আমল ০৩: তাকওয়া ও তাওয়াক্কুল অবলম্বন

আল্লাহর ভয় তথা তাকওয়া অবলম্বন করা, তাঁর নির্দেশাবলি পালন ও নিষিদ্ধ বিষয়গুলো বর্জন করা। পাশাপাশি আল্লাহর ওপর অটল আস্থা রাখা, তাওয়াক্কুল করা এবং রিজিক তালাশে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করা। কারণ, যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:

আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনই। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

সূরা আত-তালাক, আয়াত : ২-৩

অর্থাৎ যে আল্লাহকে ভয় করবে এবং আনুগত্য দেখাবে, আল্লাহ তার সকল সংকট দূর করে দেবেন এবং তার কল্পনাতীত স্থান থেকে রিজিকের সংস্থান করে দেবেন। আর যে কেউ তার উদ্দেশ্য হাসিলে একমাত্র আল্লাহর শরণাপন্ন হয় তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। বলাবাহুল্য এই তাকওয়ার পরিচয় মেলে হালাল উপার্জনে চেষ্টা এবং সন্দেহযুক্ত কামাই বর্জনের মধ্য দিয়ে।

মুফাসসিরে কেরামগন বলেন, মানুষ, ইঁদুর ও পিপীলিকা ছাড়া কোন প্রাণী-ই তাদের খাদ্য সংরক্ষন করেনা। তারা দিনে আনে দিনে খায়। আল্লাহর উপর এরকম অগাধ বিশ্বাস আছে তাদের! মানুষ যদি আল্লাহর উপর এরকম বিশ্বাস করতে পারত তাহলে তারাও এরকম রিযিক পেত। আল্লাহর রাসূল বলেন,

যদি তোমরা আল্লাহর উপর ভরসা করার মত ভরসা করতে তাহলে তিনি তোমাদের রিযিক দিতেন যেভাবে পাখিকে রিযিক দেন, যে সকালে বের হয় ক্ষুধার্ত অবস্থায় আর বিকেলে উদর পূর্তি করে ফিরে আসে।

সুনানে তিরমিযী ২৩৪৪

রিজিক বৃদ্ধির আমল ০৪: দান-সাদাকা করা

আল্লাহর রাস্তায় কেউ ব্যয় বা দান করলে তা বিফলে যায় না। সে সম্পদ ফুরায়ও না। বরং তা বাড়ে বৈ কি। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

‘বল, ‘নিশ্চয় আমার রব তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিযক প্রশস্ত করেন এবং সঙ্কুচিত করেন। আর তোমরা যা কিছু আল্লাহর জন্য ব্যয় কর তিনি তার বিনিময় দেবেন এবং তিনিই উত্তম রিযকদাতা।’

সূরা আস-সাবা’, আয়াত : ৩৯

আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসুল (সাঃ) ইরশাদ করেনঃ

“দান সম্পদ এর পরিমাণ কমায় না।”

মুসলিম ২৫৮৮

ইমাম নববী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘তারা (স্কলাররা) এই হাদীসের দুই রকম অর্থ করেছেনঃ

১। দানের মাধ্যমে সম্পদ ও এর ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে এবং সম্পদে বরকত আসবে যা দানের কারনে যে পরিমাণে কমতি হবে তা পুষিয়ে যাবে।

২। দানের বিনিময়ে আল্লাহ তা’আলা বহুগুণ বেশি সওয়াব দিবেন এবং তা যে সম্পদ দান করা হয়েছে তার চেয়ে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি দামী।’

রিজিক বৃদ্ধির আমল ০৫: বিয়ে করা ও সন্তান লাভ

আজকাল মানুষের দুনিয়ার প্রাচুর্য ও বিলাসের প্রতি আসক্তি এত বেশি বেড়েছে, তারা প্রচুর অর্থ নেই এ যুক্তিতে প্রয়োজন সত্ত্বেও বিয়ে বিলম্বিত করার পক্ষে রায় দেন। তাদের কাছে আশ্চর্য লাগতে পারে এ কথা যে বিয়ের মাধ্যমেও মানুষের সংসারে প্রাচুর্য আসে। কারণ, সংসারে নতুন যে কেউ যুক্ত হয়, সে তো তার জন্য বরাদ্দ রিজিক নিয়েই আসে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:

‘আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী।’

সূরা আন-নূর, আয়াত : ৩২

উমর ইবন খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহুমা বলতেন:

ওই ব্যক্তির ব্যাপার বিস্ময়কর যে বিয়ের মধ্যে প্রাচুর্য খোঁজে না। কারণ স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন।’

ঠিক একই ভাবে, সন্তান-সন্ততি লাভ মানুষকে দরিদ্র বানায় না। কারন আল্লাহ সুবহানুওতাআলা নিজ অনুগ্রহে তাদের রিযিক দিয়ে থাকেন। তিনি বলেনঃ

“দারিদ্রের ভয়ে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমিই জীবনোপকরণ দিয়ে থাকি। নিশ্চয় তাদেরকে হত্যা করা মারাত্নক অপরাধ।”

সূরা আল ইসরাঃ ৩১

রিজিক বৃদ্ধির আমল ০৬: আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করা

আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের হক আদায়ের মাধ্যমেও রিজিক বাড়ে। আনাস ইবন মালেক রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি ইরশাদ করেন,

‘যে ব্যক্তি কামনা করে তার রিজিক প্রশস্ত করে দেওয়া হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ করা হোক সে যেন তার আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।’

বুখারী : ৫৯৮৫; মুসলিম : ৪৬৩৯